রাতের ট্রেনে

 
রাতের ট্রেনে 

অতনু সরকার 


রাতের ট্রেনে




রাত দশটা বাজে। তামিলনাড়ুর মাদুরাই শহরের ব্যস্ততম রেল স্টেশন থেকে ট্রেন ধরলাম। বিগত দু বছর ধরে তামিলনাড়ুর এই শহরটাতে রয়েছি। দীর্ঘ চার মাস পর কয়েক দিনের জন্য বাড়ি ফিরে চলেছি। তবে আবার আমাকে ফিরে আসতে হবে। লড়াই করতে হবে জীবনের প্রতিটা মুহূর্তে।  যে স্বপ্ন আর আশা নিয়ে আমি এসেছিলাম সেই স্বপ্ন আর সেই আশা অনেকটাই কাবেরী জলে ডুবে গেছে।  


একটা পরিকল্পনা নিয়ে আমি এসেছিলাম তামিলনাড়ুতে। কর্মসূত্রে এই শহর,  শহরের মানুষগুলো কয়েকদিনের মধ্যেই অনেকটাই আপন হয়ে উঠেছিল, তাই পরিবার নিয়ে এসেছিলাম এখানে। স্বপ্ন ছিল এখানে ছেলে-মেয়েকে মানুষ করব কিন্তু নিয়তি সব সময় সমান তালে চলে না। স্বপ্ন যেখানে  এগিয়ে যায় নিয়তি হয়তো কখনো কখনো তার বিরুদ্ধে গিয়ে দাঁড়ায়। আমার স্ত্রী মানসি আমার সঙ্গে প্রায় সম্পর্ক ছিন্ন করে ফিরে গেছে তার বাবার বাড়িতে। যদিও এর পিছনে সব থেকে বড় ভূমিকা পালন করেছে মানসির বাবা-মা। তারা নাকি মেয়েকে না দেখে থাকতে পারছে না। আর মেয়েও নাকি বাবা মাকে না দেখে থাকতে পারছে না। পনেরো বছর বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর  বাবা মা কে না দেখে থাকতে না পারা টা বড্ড ছেলেমানুষি।  আর কতটা যুক্তিযুক্ত জানিনা। দুই ছেলে মেয়ের মা হয়েও এখনো পর্যন্ত সে তার বাবা-মা কে না দেখে থাকতে না পারাটা কতটা প্রাসঙ্গিক ঠিক বলতে পারবো না। তাই মেয়েটাকে নিয়ে ফিরে গেল দেশে। 


ছেলেটাকে নিয়ে যেতে  পারেনি কারণ ছেলের স্বপ্ন অনেকটাই বড়। মেয়েকে সহজেই ভুল বুঝিয়ে নিজের মত করতে পেরেছে কিন্তু ছেলেটাকে ভুল বোঝাতে পারল না।  ছোট হলেও ওর মাথাটা পরিষ্কার। যদি ওর যাবার  পিছনে আরো একটা লুক্কায়িত কারণ আছে। সেটা হল সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে জড়িয়ে পড়া তৃতীয় সম্পর্ক। হাতেনাতে ধরা পড়েছিল আমার কাছে। বারণ করেছিলাম তা নিয়ে অনেকবার ঝগড়াঝাঁটি হয়েছে। আমি ওকে মুক্ত করে দিয়েছি। 


মেয়েকে মানুষ করার জন্য আমার চেষ্টার কোনো ত্রুটি থাকবে না। মাদুরাইতে ছেলেকে নিয়ে আমার একক লড়াই।  সকালে প্র্যাকটিস। তারপর বাড়ি এসে ছেলেকে স্কুলের জন্য প্রস্তুত করা, রান্না করা,  স্কুলে পৌঁছে দেওয়া। তারপর আবার স্কুলে খাবার দিয়ে আসা। বিকেলে প্র্যাকটিস আর আমার কাজ,  সারাদিনের এই ব্যস্ত রুটিন নিয়ে আমার দিন ভালোভাবেই কাটছে।  কষ্ট যে হচ্ছে না তা নয়। ছেলে যাতে ওর স্বপ্ন পূরণ করতে পারে তার জন্য আমি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি আর চেষ্টা করে যাবো। তারপর আমার স্বপ্ন।  নিশ্চয়ই আমার স্বপ্নকে আমি তাড়া করবো। স্বপ্ন থেকে আর  আমার লক্ষ্য থেকে কিছুতেই  পিছুপা হব না, এইরকমই এক দৃঢ় প্রতিজ্ঞ মন নিয়ে আমি আর আমার ছেলে মাদুরাইতে রয়েছি।  


এখানে একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছিলাম সবাই মিলে থাকবো বলে। এখন সেই বড় ফ্ল্যাটে আমরা দুটি মাত্র মানুষ। হেসে খেলে চলছে বাবা ছেলের জীবন। এবছর দুর্গাপূজার সময় কলকাতায় ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু ওর পরীক্ষা থাকায় ঠিকমতো ট্রেনের টিকিট কাটতে পারিনি। তাই আজ ট্রেন ধরছি আজ অক্টোবর মাসের ৮ তারিখ। রাত দশটা মাদুরাই থেকে হাওড়া এক্সপ্রেস ধরে যেতে হবে। ট্রেনে  বসলাম। ট্রেনের নির্দিষ্ট জায়গা নিয়ে যখন একটু স্থিত হলাম ঠিক তখনই হন্তদন্ত হয়ে উঠলো একটি পরিবার। তারপর আমার সামনের সিটে যিনি বসলেন তাকে দেখে তো আমি অবাক। প্রথমে সে আমাকে খেয়াল করেনি।  আমি ভাবছিলাম হয়তো আমার দেখার ভুল বা মনের ভুল।  কিন্তু না সে ভুল কখনো হতে পারে না। একটা সময় যার সঙ্গে অনেকটা সময় কাটিয়েছি, গল্প করেছি,  বন্ধুত্বের আবরণ খুলে গিয়ে কখন যে ভালোবাসার জালে  জড়িয়ে পড়েছিলাম সে কথা আজ আর নাইবা বললাম।যদিও বহু বছর আগের কথা। তখন কারোর বিয়ে হয়নি।   


ছেলেকে মাঝের সিটে শুয়ে দিয়ে আমি বসলাম নিচের সিটে। দুর্ভাগ্য কি সৌভাগ্য বলতে পারি না অপর প্রান্তে নিচের সিটটাই ছিল তার। ট্রেন চলতে শুরু করেছে সঠিক সময়ে তাও প্রায় দশ মিনিট হল।  বেশ গতিতেই সে তার  আপন নিয়মে,  আপন ছন্দে রাতের অন্ধকারকে ভেদ করে ছুটে চলেছে আপন পথ বেয়ে। জানালার ধারে যে একটি প্রাণী বসে আছে এতক্ষণেও তার চোখে পড়লো না। আসলে এতটাই সে ব্যস্ত ছিল ব্যাগ পত্র গোছাতে যে অপর প্রান্তে কারা কোথায় বসে আছে সেটা দেখার মতন পরিস্থিতি তখনো তৈরি হতে হয়ে ওঠেনি। মিনিট পনেরো পর যখন সে বসলো তখনই দুজনার চোখা-চোখি হল।  তারপর নিস্তব্ধতা। ও যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না আমাকে দেখে।  আকাশ পাতাল কি যেন ভাবছে জানি না। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে এখনো পর্যন্ত চোখের পলক পড়েনি ওর। অনেকক্ষণ পর বিদিশা মুখ খুলল। বলল -  তুমি এখানে?  


আমি বললাম - এতক্ষণ পরে যে দেখতে পেলে এটাই আমার সৌভাগ্য। ঠিক একই প্রশ্ন আমিও তোমাকে করছি। তুমি এখানে কি ব্যাপার? 


বিদিশা বলল - আমরা কন্যাকুমারী বেড়াতে গিয়েছিলাম। কন্যাকুমারী থেকে রামেশ্বরম। রামেশ্বরম থেকে  মাদুরাই হয়ে এবার ফিরব বাড়ি। এবার বলতো তুমি এখানে কি ব্যাপার?  


আমি বললাম - আমি মাদুরাই তে থাকি, দু'বছর হল কর্মসূত্রে এখানে আছি।

 

বিদিশা আর ও অবাক হয়ে বলল -  দু'বছর এখানে থাকো? একা নাকি পরিবারও আছে? 


আমি একটা দীর্ঘ নিশ্বাস নিয়ে বললাম  - পরিবার ছিল ছেড়ে চলে গেছে। এই জায়গা তাদের ভালো লাগছে না।  তামিল ভাষা তারা বুঝতে পারছে না। আরো কত কি অজুহাত দিয়ে ফিরে গেছে তারা। 


বিদিশা বলল  - তাহলে এখন কোথায় চললে ? 


আমি বললাম  - কিছুদিনের জন্য বাড়ি যাবো ছেলেকে নিয়ে । অনেকদিন হলো বাড়ি ছাড়া।  বেচারা ছোট তো বাড়ির জন্য একটু মন খারাপ করে। তাই ওকে নিয়ে যাচ্ছি কিছুদিনের জন্য। 


বিদিশা বলল  - ও কি  এখানেই পড়াশোনা করে ?


আমি বললাম - হ্যাঁ এখানেই পড়াশোনা করে। বাপ বেটার দুজনের সংসার চলছে বেশ।  তারপর বলো তোমার কি খবর। 


এবার বিদিশা একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে। তারপর  বলল -  আমার আর খবর,  ডিভোর্স হয়ে গেছে। এখন যে এনজিও তে কাজ করি সেই এনজিওর মহিলা সদস্যদের সঙ্গেই প্রতিবছর ভারত ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ি। এত বড় ভারতকে  দেখতে ইচ্ছা হয় তাই ভারতবর্ষকে দেখার জন্য বেরিয়ে পড়ি। 


আমি একটু অবাক হয়ে বললাম - ডিভোর্স হলো কি করে?  ভালোই তো চলছিল তোমার জীবন। সংসার ছেলে মেয়ে। 


বিদিশা একটু মুচকি হেসে বলল -  আপাতদৃষ্টিতে খারাপ চলছিল না কিন্তু জীবনের পথ সব সময় তো সহজ এবং সরল পথে চলে না। ভদ্রলোক আবার প্রেমে পড়লেন।  তারপর শুরু হল দুজনের বিচ্ছেদ ঝগড়া এবং সেখান থেকে ফাইনালি আমি ডিভোর্স নিয়ে নিলাম। কোন কিছু চাইনি। কিছু দাবি করা  বা মাসে মাসে টাকা চাওয়া আমার কাছে নির্লজ্জতা মনে হয়েছিল। তাই ওই ঝামেলা  রাখলাম না।


আমরা যখন কথা বলছিলাম তখন উপরের সীট থেকে বিদিশার এক সহকর্মী বলে উঠলো -  কি রে রাত হয়েছে ঘুমাবি না?   কি এত বকবক করছিস? 


বিদিশা উত্তর দেয় -  দিদি একদিন যার জন্য সবকিছু ত্যাগ করতে রাজি ছিলাম আমার সেই স্বপ্নের মানুষ আজ আমার সামনে।   


উপরের সেই ভদ্রমহিলা তখন ধরফর করে উঠে বসেছেন। তারপর বললেন -  কি বলছিস তুই? তার মানে তুই যে ছেলেটির কথা বলেছিলি কি নাম যেন… ঠিক মনে করতে পারছিনা।  


আমি ভাবলাম উত্তরটা দিয়ে দি।  তারপর ভাবলাম থাক দেখা যাক কোথাকার জল কোথায় গড়ায়। 


বিদিশা নিচ থেকে উত্তর দিল - তোমার মনে নেই?  তার কথা কতবার বলেছি তোমার কাছে।  সেই গো,  সেই অয়ন। 


উপরের ভদ্রমহিলা এবার বললেন -  অয়ন বাবুকে এখানে কোথায় আবিষ্কার করলি? 

বিদিশা উত্তর দিল -  আবিষ্কার কি সব সময় করা যায়?  কখনো কখনো আবিষ্কার আবিষ্কারকের সামনে এসে উপস্থিত হয়। বুঝলে সুচরিতা দি। 


সেই ভদ্র মহিলা অর্থাৎ সুচরিতা দি  উত্তর দিলেন -  কথায় বাপু তোর সঙ্গে পেরে উঠা দায়। তা সে যাই হোক রাত তো অনেক হলো কাল সারাদিন পড়ে রয়েছে তখন না হয়।…। 


বিদিশা বলল  - দিদি একদিন যার জন্য আমার ঘুম হতো না, যাকে পাবার জন্য ……… যাক গে।  তারপর কোথা থেকে যে কি হয়ে গেল বুঝতে পারলাম না।  এতদিন পর আবার চোখের সামনে।  একসময় যে আমার স্বপ্নের মানুষ ছিল তাকে চোখের সামনে রেখে কি করে ঘুমাই বলোতো? 


সেই দিদি আর কোন কথা বলল না।

আমাদের কথা গুলো আসেপাশের কয়েক জন বেশ কৌতূহল হয়ে  শুনছিল। কিন্তু আমাদের সেদিকে কোন খেয়াল ছিল  না। 


সময়ের দীর্ঘ স্রোতে  জীবন থেকে অনেকটা বছর হারিয়ে গেছে। ট্রেন চলছে তার আপন গতিতে। ঘড়ির কাঁটায় একটু একটু করে সময় গড়িয়ে চলেছে। রাত এগারোটা। সকলেই প্রায় শুয়ে পড়েছে আমাদের এইখানটাতে সবাই ঘুমে মগ্ন। দুজন খুব নিচু গলায় কথা বলছিলাম।  


বিদিশা বলছিল ওর জীবনের কথা। যদিও বেশিরভাগটাই জানি তবুও অজানা কিছু কথা শুনতে বেশ ভালই লাগছিল। শুনতে শুনতে মনে পড়ে যাচ্ছিল কলেজ জীবনের কথাগুলো, গঙ্গার ঘাটে বসে কতটা সময় বেরিয়ে গেছে গল্প করতে করতে। সেই গঙ্গা দিয়ে কত জল হয়ে গেছে, বয়ে গেছে অনেকটা সময়। আজ মধ্য যৌবনে আবার মুখোমুখি। কিন্তু এখন আর কলেজ জীবনের সেই প্রেম ভালবাসা কিছুই নেই। সবই জমা খরচের তালিকায় খরচ হয়ে গেছে। কতদিন পরে ওর সঙ্গে দেখা হিসাব করতে হবে। যদিও সে হিসাব করে কোন লাভ হবে না। বিদিশা বলছিল প্রথম প্রথম ভালোই চলছিল সংসার তারপর একটু একটু করে ভাঙতে ভাঙতে শেষ পর্যন্ত ভেঙে গেল। 


অশ্রুসিক্ত বিদিশা বলল- জানো সংসারটা ভাঙতে চাইনি অনেক চেষ্টা করেছিলাম, সহ্য করে ছিলাম কিন্তু হলো না। ওর বার বাড়ন্ত এতটাই হয়ে গেল যে কিছুতেই আর মানিয়ে নিতে পারলাম না। ভাবলাম যেখানে নিজের সম্মান নেই সেখান থেকে সরে আসাই ভালো। বাপের বাড়িতে গিয়ে তাদেরও বিড়ম্বনার শিকার হব তাই ওই ভুল কাজ করলাম না। বাবা মা যদি ও এখনো বেঁচে আছে কিন্তু তাদের গলদ গ্রহ হয়ে থাকার মতন ইচ্ছা আমার ছিল না।  তাই একটা এনজিওতে কাজ নিলাম। এদের আন্ডারে একটা বৃদ্ধাশ্রম, অনাথ আশ্রম এবং স্কুল চলে। সেই স্কুলে পড়াই। বলতে পারো সংসার নেই কিন্তু সম্মান নিয়ে বেঁচে আছি। 


অন্ধকারে দেখলাম বিদিশা কাপড়ের আঁচল দিয়ে চোখ মোছার চেষ্টা করছে। জীবনের দুঃখময় দিনগুলো যখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে আপনা আপনি চোখের কোনায় জল চলে আসে। 


বিদিশা বলল তোমার কি খবর বলো? বাপ-বেটা একা থাকো কেন?


আমি বললাম- সে অনেক কথা বিদিশা তবু এতদিন পর তোমার সঙ্গে যখন কথা বলার সুযোগ পেয়েছি, না বলার কিছু নেই প্রত্যেকটা মানুষের জীবনে কিছু দুঃখ যন্ত্রণা, কিছু ভালোবাসা ভালোলাগা আনন্দ থাকে সেই সমস্ত দুঃখ যন্ত্রণা আনন্দ কারো না কারো সঙ্গে ভাগ করে নিতে হয়। তবেই সে শান্তিতে থাকতে পারে। যখন তার সুখ দুঃখ আনন্দ কিছুই ভাগ করার লোক পায় না তখন সে নিঃসঙ্গ হয়ে যায়। যাদের জন্য বন্ধু-বান্ধব আত্মীয়-স্বজন সবকিছু ত্যাগ করেছি কর্মে ডুবিয়ে রেখেছি নিজেকে তারাই ছেড়ে চলে গেল আমাদের। 


বিদিশা বলল - তোমার স্ত্রীর কথা বল। ভয় নেই আমার বয়স হয়ে গেছে। 


একটু হাসলাম আমি। তারপর বললাম-  যদিও আমি কখনোই নিজেকে ভাবি না যে আমি মধ্য বয়সে। আমার মন এখনো সেই পঁচিশ এর গণ্ডিতে আবদ্ধ। আমার মন আমার যৌবন বয়স কে মানে না। আমার কাছে বয়স একটা সংখ্যা মাত্র। বুঝলে? আমি আমার কর্ম জগত নিয়ে এতটাই ব্যস্ত যে ওদের জন্য হয়তো সময় দিতে পারিনি ওরা শুধু টাকা চায় সোনা  গয়না চায়। শুধু টাকা টাকা আর টাকা। এই মানুষটাকে কেউ চাইলো না জানো? তুমিও তো চাওনি এই মানুষটাকে তাই সেদিন আমাকে ফেলে তুমিও চলে গিয়েছিলে। চলে গিয়েছিলে অন্য এক অধারা স্বপ্নের নেশায় অপেক্ষা করনি তুমি আমার জন্য। তুমি ভেবেছিলে আমি হয়তো আর ফিরবো না। সেই সময় যদি এখনকার মতন ফোন থাকতো তাহলে হয়তো….,   যাক সেসব কথা। এক বছর পরে ফিরে এসে শুনলাম। তোমার বিয়ে হয়ে গেছে। খোজ খবর নিলাম দেখলাম তুমি সুখে আছো। তাই আর কোনদিন তোমাকে জ্বালাতন করার চেষ্টা করিনি।  বিদিশা আজ অনেক বছর পর তোমাকে দেখা মাত্রই মনের ভেতরটা বলতে পারো বুকের ভেতরটা কেমন টনটন করে উঠলো। বিদিশা তোমাকে যে আমি কতটা ভালবেসেছিলাম সে কথা তুমি হয়তো জানতে না। 


বিদিশা বলল- জানানোর চেষ্টা তো করনি কখনো। আমিও যে তোমাকে ভালবাসতাম তুমি যে আমার স্বপ্নের মানুষ ছিলে সে কথা তো তুমি বুঝতে পারোনি। হয়তো আমি বোঝাতে পারিনি তোমায়। তারপর হঠাৎ একদিন হারিয়ে গেলে তুমি। খবরের কাগজে তোমার নাম শুনতাম। খেলাধুলার জগতে তোমার অবদান শুনতাম কিন্তু তুমি তখন বাংলার বাইরে তুমি তখন ধরাছোঁয়ার বাইরে। বাবা মা জোর করে বিয়ে দিয়ে দিল। আমার কিছু করার  ছিল না জানো। তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করার উপায় আমার কাছে ছিল না। আজকের মত যদি এই নেটের দুনিয়া আর ফোনের রমরমা থাকতো তাহলে হয়তো। যাক কি হতো সে কথা এখন আর ভেবে লাভ নেই। ফেলে এসেছি যৌবনের অনেকটা সময় পড়ন্ত যৌবনে জীবনের এই মধ্য লগ্নে তোমাকে যে আবার দেখবো কল্পনাও করতে পারিনি। 


আমি বললাম -  খেলাধুলা ছাড়ার পরে খেলাধুলার মধ্যেই বেঁচে থাকার রসদ খুঁজে নিলাম। আমার জীবন,  যাযাবর জীবনের মতন। হয়তো তাই আমার স্ত্রী কন্যা পছন্দ করলো না আমার সঙ্গে থাকার। আজ এখানে কাল সেখানে কিন্তু এই ছেলেটা  দেখো সেও বেছে নিয়েছে খেলাধুলার জীবন। খেলাধুলা জীবনের যে নির্মলতা আর আনন্দ দেয় সে বোঝার ক্ষমতা  সবার হয়না। বড় হয়ে কি হবে বলতে পারি না। যা হওয়ার হবে কিন্তু আমি চাই একদিন হও ভারতের হয়ে খেলুক ভারতের পতাকা উপরে তুলে ধরুক নিশ্চয়ই ও করবে পারবে সেই যোগ্যতা ওর আছে। 

বিদিশা বলল - ঈশ্বরের কাছে সেই প্রার্থনা করি যেন তোমার স্বপ্ন পূরণ হয়। তারপর ফিরবে কোথায়? 


বললাম- বাড়িতে ফিরব মা ভাই-বোনরা তো আছে। কয়েকদিন কাটিয়ে এই দীপাবলির পর ভাইফোঁটা মিটিয়ে আবার ফিরব এখানে। ভালো লাগে ছেলেদের মধ্যে থাকতে। মাঠে থাকলে জীবনের দুঃখগুলো ভুলে থাকতে পারি। কিন্তু বিবাহিত জীবন আমার কাছে অগ্নিকুণ্ডের মতন জ্বলন্ত বিভীষিকা। মানসিক শারীরিক নিপীড়নে আমি ক্লান্ত। শুধুমাত্র সংসার করার তাগিদেই কোন রকমে  জোড়া তাপ্পি দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছি। এর থেকে ডিভোর্স হয়ে যাওয়া অনেক ভালো জানো। অন্তত এই মানসিক যন্ত্রণা থেকে বাঁচা যায়। যে মানসিক যন্ত্রণা প্রতিদিন প্রতিনিয়ত আমাকে ভোগ করতে হয়, সে মানসিক যন্ত্রণা যে কত বড় যন্ত্রণা, সে আমার মত ভুক্তভোগেরাই বোঝে, তুমিও বোঝো। কারণ তুমিও সেই যন্ত্রনাকে অতিক্রম করেই ডিভোর্স নিয়ে এখন হয়তো ভালো আছো।

 

বিদিশা - সংসারে ভালো থাকতে চেয়েছিলাম কিন্তু পারলাম কই। তাই তো সংসার থেকে মুক্তি নিয়ে আরেকটা সার্বজনীন সংসারের দায়িত্ব তুলে নিলাম। এখানে ভালো আছি। এই যে যারা দেখছো আমার সঙ্গে রয়েছে সবাই ওই স্কুলের দিদিমণি সবাই আমার মতনই কেউ ঘর ছাড়া কিউবা অবিবাহিত এদের সঙ্গে ভালোভাবে কেটে যায়। মাঝে মাঝে ছেলে মেয়েদের সঙ্গে সময় কাটাই। ওরাও বেশ ভালো আছে। 


আমি বললাম তোমার ঠিকানাটা দিও আর ফোন নাম্বারটা অবশ্য যদি তুমি দিতে চাও, জোর করব না। 


বিদিশা সঙ্গে সঙ্গে তার ফোনটি বার করে আমার সঙ্গে ফোন নাম্বার বিনিময় করে নিল তারপর বলল-  যার স্বপ্নে আমার যৌবন কেটেছে তার সম্পর্কে বাজে কথা ভাবতেও আমার ঘৃণা হয়। হয়তো তোমার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়নি কিন্তু তুমি কি ভুলে যেতে পারো কলেজ জীবনের সেই দিনগুলো। যদিও তখন তোমার জনপ্রিয়তা কলেজের সর্বজনবিদিত। 


আমি বললাম কিন্তু আমি ছিলাম গরিব ঘরের সাধারণ ছেলে তাই হয়তো এড়িয়ে যেতে চেয়েছি প্রেম ভালোবাসার মতন সম্পর্ক  গুলোকে তারপর কখন যে তোমার প্রেমে ডুবে গিয়েছিলাম বলতে পারব না হয়তো তাই তোমার সঙ্গে জীবনের একটা অধ্যায় কেটেছে।  


বিদিশা বলল - জানো, অবসর সময় গুলোতে না আমি এখন গল্প লিখি, যদি তুমি অনুমতি দাও তোমাকে নিয়ে একটা গল্প লিখব।

 

আমি হাসতে হাসতে বললাম - আমি কখনো গল্পের চরিত্র হতে পারি? আমার মতন সাধারন একটা জীবন গল্পের চরিত্র হয়না বিদিশা। গল্প চরিত্র হয় নায়কদের নিয়ে নায়িকাদের নিয়ে। আমার মতন সাধারণ চরিত্র নিয়ে … তবে তুমি যদি লিখতে পারো তাহলে আমার কোন আপত্তি নেই। তুমি গল্প লেখ শুনে আমার খুব ভালো লাগছে। তোমার গল্পগুলো পাঠিয়ো সময় করে ঠিক পড়ে নেব। 


বিদিশা বলল - এখনো কি তোমার গল্প পড়ার নেশা আছে? এখনো কি রাত জেগে তুমি গল্পের বই পড়ো? 

 

আমি বললাম - পড়ি। গল্পের বই আমার বন্ধু। 


বিদিশা বলল - তোমার মনে আছে সেই বইমেলায় তুমি আর আমি হাতে হাত রেখে হাট ছিলাম হঠাৎ তোমার এক দাদার সঙ্গে দেখা। 


আমি বললাম - মনে থাকবে না, খুব মনে আছে দুজন দুদিকে দৌড়েছিলাম কিন্তু দুজনের চোখ ছিল কে কোন দিকে যাচ্ছে তার উপর কারণ হারিয়ে গেলে আর যোগাযোগ হবে না। এত বড় বই মেলায় এত মানুষের ভিড়ে কে কাকে খুঁজে পায় বল।


বিদিশা বলল -  সেই সব দিন মনে পড়লে এখন হাসি পায়। 


আমি বললাম - হাসি পাবারই কথা তখন ছিল ছেলে মানুষি। আর এখন পরিণত বয়সের সেই সব ছেলে  মানুষি কথাগুলো মনে করলে তো হাসি পাবে।


বিদিশা বলল -  তোমার বউ কি তোমার সঙ্গে থাকে না? 


আমি বললাম - না থাকে না। বাংলায় ওরা ওদের মতন বেছে নিয়েছে জীবন মেয়ের পড়াশোনার খরচ হাত খরচ আর সংসারে খরচের কিছু টাকা আমি দি বটে কিন্তু সম্পর্ক বলতে কিছুই অবশিষ্ট নেই।  যে স্ত্রী তার স্বামীর সঙ্গে থাকে না তার স্বামী জোর করে তাকে রাখবো কি করে। জোর করার চেষ্টা করিনি।  তাছাড়া এই ফেসবুকের যুগে সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে নানান সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে ওর মাথাটা গেছে খারাপ হয়ে।  এক সঙ্গে কতগুলো সম্পর্কে যে রয়েছে। যাক অসব কথা আর ভাল লাগে না।  ছেলেকে মানুষ করার জন্য মাদুরাই তে পড়ে আছি, বলতে পারো একক নিঃসঙ্গ জীবন। ছেলে  চলে যায় স্কুলে সারাটা দিন আমার নিঃসঙ্গতা আমাকে কুরে কুরে খায়। নিঃসঙ্গতার মধ্যে নীরবে কেটে যায় দিনের পর দিন। জীবন যৌবন সবই নিঃসঙ্গতার মরুভূমিতে ডুবে গেছে। কিছু মানুষ টাকা ছাড়া কিছু  চায় না, টাকা পেলেই সন্তুষ্ট। বাবা মার প্রশ্রয় যতদিন আছে  চলুক।পরে  বুঝতে পারবে কত ধানে কত চাল। জীবনে বাঁচা যে এত সহজ নয় পরিশ্রম ছাড়া যে বাঁচা যায় না একদিন ঠিক  বুঝতে পারবে।  যে স্ত্রী তার স্বামীর পরিশ্রমের সময় পাশে থাকে না সে স্ত্রী থেকে কি লাভ। আমি ভুল না খারাপ সে কথা বিচার করার জন্য আদালতের দ্বারস্থ হবো না আমি আমার মতন আমার এই নিঃসঙ্গ একাকী জীবনটাকে ধীরে ধীরে বয়ে নিয়ে যাব। দীর্ঘ একাকীত্ব এই জীবনের ইতিহাস খুবই কঠিন এবং নির্মম।  জান বিদিশা যখন আমার কিশোরকাল যখন আমার বড় হওয়ার বয়স সেই তখন থেকেই আমি নিঃসঙ্গ এবং নিঃস্ব জীবনের প্রতিটা মুহূর্তে খাদ্যের জন্য লড়াই করেছি। প্রত্যেকটা মুহূর্তে বাঁচার জন্য লড়াই করে বড় হয়েছি, মাঝের কয়েকটা বছর শুধু ভালো-মন্দ আর এক নির্মম সত্যকে প্রত্যক্ষ করেছি। তারপর আবার সেই মহা সমুদ্রে ডুবে গেছি। বলতে হয় তাই বলা  খুব ভালোই আছি, মাঝে মাঝে মনে হয় সবকিছু ফেলে চলে আসি বন্ধু-বান্ধব সবাইকে নিয়ে আড্ডা বেঁচে থাকি কিন্তু তারপর মনে হয় এ জীবন কতদিনের শুধু আড্ডা আর বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে কি জীবন তার বাইরেও তো একটা জীবন আছে। 

সেখানে নিঃসঙ্গতা থাকলেও খারাপ লাগে। তুমি যখন গল্পটা লিখবে তখন লিখো সেই সব কথা। চরম দারিদ্রতাকে উপেক্ষা করে একটু একটু করে বড় হওয়া একটা ছেলের কথা। সেই ছেলেটা একদিন তোমার স্বপ্নের নায়ক হয়েছিল। তবে কেন জানি তোমার স্বপ্নে ঠাই পেয়েছিলাম।  সে কথা আমি বলতে পারি না কারণ তথাকথিত সুন্দর বলতে যা বোঝায় আমি তা নই।  তারপরেও যখন তোমার কাছে ভালো লেগেছিল তখন নিশ্চয়ই তুমি কিছু বুঝেছিলে।  ভালো আমারও তোমার লেগেছিল হয়তো সেই জন্যই গঙ্গার ঘাটে বসে তোমার সঙ্গে জীবনের অনেকটা সময় কাটিয়েছি। কিন্তু সেই বন্ধুত্বের বেড়াজাল ভেদ করে তোমাকে ভালোবাসি এ কথাটা বলার শক্তি বা সাহস তখন আমার ছিল না। তাই দুজন আজ দুই প্রান্তে। 


গল্প করতে করতে রাত তিনটে বাজলো, আরো কত কথা কত স্মৃতি একে একে উদয় হলেও দুজনার মনের মাঝে প্রেম তখন প্রচন্ড গতিতে ছুটে চলেছে সামনের দিকে। রাতের নিঃশব্দ নীরবতাকে ভঙ্গ করে কুহু কুহু করে ট্রেন  ছুটে চলেছে আপন কর্তব্য পথে।

 

বিদিশা বলল আমি একটু রেস্ট রুমে যাবো, যাবে আমার সঙ্গে। আমি বললাম আমাকেও যেতে হবে চলো। 


এসি রুমের বাইরে এসে বুঝতে পারলাম ট্রেনের গতিবেগ।  দরজাটা অল্প খোলা ছিল সেখান থেকে ঝড়ের মতো হাওয়া ঢুকছে।  দুজন একটু দাঁড়ালাম সেই হাওয়ার সামনে।  বিদিশার চুল গুলো বেণী থেকে মুক্ত হয়ে খোলা হাওয়ায় যেন ডানা মেলে দিয়েছে । চলন্ত ট্রেন যখন খুব গতিতে ছুটছে হঠাৎ একটা ছোট্ট ঝাঁকুনিতে বিদিশা আমার বুকের মধ্যে এসে পড়ল। কিন্তু নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে না। আমার একটা হাত ছিল অর্ধ খোলা দরজার কাছে। আর একটা হাত কখন যেন বিদিশার পিঠে পড়েছে জানি না।  সে আমাকে জড়িয়ে ধরে আছে। হঠাৎ দেখলাম সে একটু ডুকরে ডুকরে কাঁদছে। 


বলছে - একদিন আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম এই বুকে মাথা রাখার। আজ সেই স্বপ্ন পূরণ হলো। আপন গতিতে ট্রেন ছুটে চলেছে। আমার বুকের মধ্যে মাথা রেখে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে চলেছে বিদিশা। এই প্রথম বিদিশা আমার  এত কাছাকাছি। এতটাই কাছে যে ওর বুকের হৃদস্পন্দনটাও যেন মিশে যাচ্ছে আমার হৃদস্পন্দনের সঙ্গে। 




Post a Comment

You are Welcome to the Kotha Koli

Previous Post Next Post